
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি মাদ্রাসা ভবনে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার একতলা ভবনের পশ্চিম পাশের দুটি কক্ষ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় নারী ও শিশুসহ চারজন আহত হন।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল তল্লাশি চালিয়ে বিস্ফোরক, রাসায়নিক দ্রব্য এবং বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে ছিল—উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা, স্টিলের ক্ষুদ্র বল (স্প্লিন্টার), শটগানের সিসা, গান পাউডার, প্রায় ৪০০ লিটার রাসায়নিক দ্রব্য, গ্লিসারিন, বৈদ্যুতিক ড্রিল মেশিন, রিমোটযুক্ত চাবির রিং, স্পাই ক্যামেরা, ওয়াকিটকির চার্জার, হাতকড়া, পুলিশের বেল্ট, উগ্রবাদী বইসহ নানা সামগ্রী। উদ্ধার করা বোমাগুলো পরবর্তীতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঝিলমিল এলাকার একটি ফাঁকা স্থানে ধ্বংস করে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম জানান, বিস্ফোরণের পরপরই বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও ক্রাইম সিন ইউনিট কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্তাধীন রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জাকির হোসেন জানান, বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দের সঙ্গে একটি ভারী বস্তু এসে তার মাথায় আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাকে দ্রুত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঢাকা জেলা পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণের সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সক্রিয় সদস্য শেখ আল আমিন ওরফে রাজিবের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, মাদ্রাসার আড়ালে সেখানে বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতগুলো সুসংগঠিত জঙ্গি কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
পুলিশ জানায়, শেখ আল আমিন দীর্ঘদিন ধরে জেএমবির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং তামিম–সারোয়ার গ্রুপের সদস্য। বিস্ফোরণের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী আছিয়া বেগম, বড়ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার এবং আসমানী খাতুন নামে এক নারীকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে মাদ্রাসা পরিচালনার আড়ালে বিস্ফোরক তৈরির কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মাদ্রাসার আড়ালের বাস্তব চিত্র
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদ্রাসার ভবনের এক অংশে নিয়মিত পাঠদান চললেও অপর অংশে বসবাস করতেন পরিচালক শেখ আল আমিন ও তার পরিবার। সেখানে প্রায় ৩০–৩৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। বিস্ফোরণে আল আমিন, তার স্ত্রী ও তাদের দুই শিশু সন্তান আহত হন এবং তারা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ভবনমালিক পারভীন বেগম জানান, মাদ্রাসা পরিচালনার কথা বলে ভবনটি ভাড়া নেওয়া হলেও ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম চলছিল, তা তিনি জানতেন না। বিস্ফোরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার সামনেই বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
তদন্তে উঠে এসেছে, মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুফতি হারুন ইজহার উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তার পরিচালিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এর আগেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত আলামত দেখে আত্মঘাতী বিস্ফোরক ভেস্ট তৈরির স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিস্ফোরক ভেস্ট দূরনিয়ন্ত্রিত বা ইলেকট্রনিক সুইচের মাধ্যমে সক্রিয় করা সম্ভব, যা জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ধর্মীয় শিক্ষার নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সুপরিকল্পিত জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল, যা দেশের নিরাপত্তা ও সমাজব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।